Tuesday April 2026

হটলাইন

কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী, ২০২৬ এ ০১:০৯ PM

একজন জয়িতার গল্প

কন্টেন্ট: গল্প নয় সত্যি

আমি ফৌজিয়া আক্তার চৌধুরী, পিতা: লিয়াকত আলী চৌধুরী, মাতা: রাজিয়া চৌধুরী, স্বামী: সামশুদ্দীন চৌধুরী, গ্রাম: মধ্য কাঞ্চনা, ডাকঘর: কাঞ্চনা হাই স্কুল, উপজেলা: সাতকানিয়া, জেলা: চট্টগ্রাম।


আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন মেয়ে, পড়াশুনায় ছাত্র জীবনে মেধাবী ছিলাম, পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে আমি সবার বড়। উচ্চ মাধ্যমিক পরিক্ষা দেওয়ার পরে পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়ে যায়। আমার স্বামী তখন একজন প্রবাসী, শশুরবাড়ি ছিলো যৌথ পরিবার। শশুর-শাশুড়ি মারা গেছে আমার বিয়ের অনেক আগে। শশুর বাড়িতে আমার স্বামীসহ ৫(পাঁচ) ভাই এর মধ্যে আমার স্বামী সবার ছোট। যৌথ পরিবারে একসাথে চলা ও দিন অতিবাহিত করা আমার জন্য সহজ ছিল না। কিন্তু আমার স্বামীর অনুপ্রেরণা ছিল শতভাগ। স্নাতক ভর্তি হই, বিয়ের এক বছর পর আমার প্রথম সন্তান হয়। সন্তান লালন পালন করে যৌথ পরিবারে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে আমার খুব কষ্ট হয়, তবুও শেষ পর্যন্ত স্নাতক-এ সেকেন্ড ডিভিশনে পাশ করি। কিন্তু ততক্ষনাৎ আমার স্বামী বিদেশে কোন এক সমস্যার কারণে বাংলাদেশে চলে আসে। পরবর্তীতে সে আর দেশের বাহিরে যেতে পারে নাই।বেকার হয়ে পড়েন আমার স্বামী। শশুর বাড়িতে আলাদা করে দেয়া হয়। যে যার মতো করে আলাদা হয়ে যায়। ঠিক ঐ সময়ে আমি সাতকানিয়া গ্রীনল্যান্ড মাল্টি পারপাস নামক ১টি প্রতিষ্ঠানে একাউন্টস অফিসার হিসেবে যোগদান করি। আমার বেতন দিয়ে আমরা তিন জন অর্থ্যাৎ আমি, আমার স্বামী ও আমার মেয়ে খুব ভালোভাবে চলছিলাম। চাকরির বয়স ৩ বছরের মাথায় আমার আরেকটা বেবি পেটে আসে। আমি মাতৃত্বজনিত ছুটিতে আসি এবং আমার ২য় সন্তানটা মেয়ে হয়। আমার ছোট মেয়ের বয়স যখন ৩৮ দিন অসুস্থতার কারণে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে ডাক্তার দেখাতে যায়। ডাক্তারের জন্য অপেক্ষারত অবস্থায় রুমে পত্রিকা পড়ছিলাম সেখানে দেখতে পেলাম চট্টগ্রাম মেরনসান স্কুল এন্ড কলেজে শিক্ষক নিয়োগের একটি সার্কুলার। আমি সেখানে আবেদন করি ও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই, তখন আমার স্বামী বেকার। সাতকানিয়া থেকে চলে যায় চট্টগ্রাম। সেখানে আমার ভাইয়েরা থাকতো পড়াশুনার জন্য আমার বাবা-মা কে নিয়ে ছোট ২ রুমের একটি বাসায়।ঐ বাসায় আমি ও উঠলাম আমার বাচ্চাদের নিয়ে। বাবা মা ২ জনেই দেখতো আমার বাচ্চাদের। আমার স্বামী সাতকানিয়া ও চট্টগ্রাম আসা যাওয়াতে থাকতো। বড় মেয়েকে আমি যে স্কুলে শিক্ষকতা করি সে স্কুলে ভর্তি করালাম। শিক্ষকতার পাশাপাশি টিউশনি করতাম আস্তে,আস্তে কিছুদিন পর আমি আলাদা বাসা নিই। আমার স্বামীকে একটা ঔষুধের দোকান দিতে অর্থনৈতিক সহযোগীতা করে থাকি। এর মধ্যে আমার দ্বিতীয় বাচ্চার বয়স যখন ৯ মাস তখন কিডনি জনিত অসুস্থতার কারণে মারা যায়। তখন আমি ডিপ্রেশনে চলে যায়।তারপর আমার স্বামী ঔষুদের দোকান লস হচ্ছে বলে ছেড়ে দেন ৮ মাসের মাথায়। পরিবারে নেমে আসে অশান্তি অভাব অনাটন আমার একার ইনকামে চলতে থাকে সংসার, পরিশ্রম করে ইনকাম করছি। এর মধ্যে আমার ৩য় বাচ্চা ০১টি ছেলে সন্তান জন্মলাভ করে এবং চট্টগ্রাম থাকাকালীন কক্সবাজার একটি এনজিও তে ভালো বেতনের একটি সার্কুলার পেলে আবেদন করি এবং সেখানে নির্বাচিত হই। বেতন ছিল ৪৮০০০/- টাকা আবার স্ব-পরিবারে কক্সবাজার চলে আসি। প্রায় ৬ বছর চাকরি করি এবং আমার আর একটি বেবি হয়। এখন আমার ২মেয়ে ১ ছেলে। এর মধ্যে এক সময় আমার স্বামী স্ট্রোক করলে আমার জীবনে নেমে আসে এক ভয়াবহ দুরাবস্থা। বাচ্চা সামলিয়ে চাকরি করা আমার জন্য কঠিন হয়ে যায়। এক সময় বাধ্য হয়ে চাকরি ছেড়ে দিতে হলো। কিছু টাকা সঞ্চয় করে ও ১টি ঋণ নিয়ে একটা রেষ্টুরেন্ট করি। আমার স্বামীও সেখানে সময় দিতে থাকে। এভাবে চলতে চলতে কোভিড নামক এক মহামারি তছনছ করে দেই আমার সংসার। বন্ধ হয়ে যায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ৩টি ছেলে-মেয়ে, অসুস্থ স্বামী, বাসা ভাড়া, সব মিলে আমি চোখে যেন কিছুই দেখছি না। তারপর মোবাইলে একটা পেইজ খুললাম। আমার ফেসবুক পেইজ এর নাম চৈতি (লিংক- https://www.facebook.com/share/g/15GMnqWGBP)।আমার ফেসবুক পেইজ খোলার জন্য অনেক পরিশ্রম করি। যারা এগুলো জানে তাদের বললাম কেউ খুলে দেয়নি, কারো থেকে সহযোগীতা ও পাইনি। চলে গেলাম চট্টগ্রাম আমার বাবার বাসায়, সেখানে একজনকে দিয়ে পেইজ খুলি এবং বিভিন্ন গ্রুপ থেকে কোড নিয়ে থাকি, সেল পোস্ট করার জন্য, কি সেল করবো ভাবতে থাকি। বিছমিল্লাহ করে হিজাব নিয়ে শুরু করলাম। মায়ের কাছ থেকে মাত্র ২০০০ টাকা নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ১২ পিস হিজাব কিনে কক্সবাজার যায়। আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর অশেষ রহমতে ২/১ দিনের মধ্যে আমার ০৫টা হিজাব অর্ডার হয়। কক্সবাজার সদরে আমার স্বামী ডেলিভারী দিয়ে থাকে আমার অর্ডারকৃত হিজাবগুলো। আমার আগ্রহ আরও বাড়তে থাকে। এভাবে করে, একসময় হিজাবের কাপড় এনে হিজাব নিজে তৈরি ও সেলাই করি। তারপর একটা সুযোগ আসলো বাংলাদেশ ব্যাংক ২৫০ জন উদ্দ্যোক্তাকে নিয়ে ট্রেনিং দেওয়ার জন্য একটা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন, সেখান থেকে পরীক্ষার মাধ্যমে ২৫ জনকে নির্বাচিত করলে উক্ত ট্রেনিং এ আমিও নির্বাচিত হয়। একমাস ব্যাপী এই ট্রেনিং থেকে মাত্র ০৩ জনকে ফান্ড দেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এর টীম নির্বাচিত করলে আমিও নির্বাচিত হই। ব্যাংক এশিয়া স্পনসর করে তাদের খরচে বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের ঢাকা নিয়ে যায় এবং গভর্নর এর কাছ থেকে ১,০০,০০০/- টাকার চেক গ্রহণ করি। সে ১,০০,০০০ টাকা দিয়ে আমি একটি ছোট কারখানা দিই। সেখানে আমার ডিজাইন করা বোরকা বানাতে থাকি ও অনলাইনে সেল করে আলহামদুলিল্লাহ বেশ পরিচিতি লাভ করি। আমার দোকানে আমি সার্বক্ষনিক এবং নিজের কারখানায় নিজের ডিজাইন করা বোরকা, টপস, টু-পিচ এগুলো সেল করি। সাপ্লাই দিয়ে থাকি সারা বাংলাদেশে আলহামদুলিল্লাহ।বর্তমানে আমার মাসিক আয় প্রায় ১,৮০,০০০/- টাকা। ২০১৯ সালে এল.এল.বি তে ভর্তি হই ঢাকা ল-কলেজে। প্রিলিমিনারি পাশ করিএবং সেকেন্ড ক্লাস পাই।আগামী জানুয়ারি ২০২৫ এ ইনশাল্লাহ ফাইনাল দিব। বর্তমানে আমার আউটলেট ও এল.এল.বি পড়াশুনা চলমান আছে আলহামদুলিল্লাহ।

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন